বিবিধ

অনলাইনে পিডিএফ ডাউনলোড করা ও পড়া কি জায়েজ?

ফাতওয়া প্রদানেঃ মুফতি মুহাম্মদ আব্দুর রহমান

এটি একটি নব্য সৃষ্ট মাস’আলা। তাই এখানে মুজতাহিদ আলেমগণের ইজতিহাদ থাকবে। কাজেই কেউ নিন্দনীয় নয়। উসুল অনুযায়ী ইজতিহাদ হলে তাঁরা সবাই সাওয়াবের অধিকারী হবেন, ইনশা’আল্লাহ। আসুন এ সম্পর্কিত আলোচনা দেখা যাক।

শায়খ সালিহ আল মুনাজ্জিদ হাফিজাহুল্লাহ ও শায়খ মুহাম্মদ বিন সালিহ আল উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহের ফাতওয়ার আলোকে লেখাটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

ইন্টারনেটে থাকা কিতাবগুলো ডাউনলোড করা এবং সেখান থেকে তা পাঠ করাতে কোন সমস্যা নেই। কেননা, তা এই দুইটি ক্ষেত্রের একটিতে পতিত হবে,  হয়তোবা কিতাবগুলো মালিকের বা লেখকের অনুমতি সাপেক্ষে ইন্টারনেটে প্রকাশ করা হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ­ এমন কিতাবের সংখ্যা অনেক। এক্ষেত্রে কিতাবের মালিক বা লেখকেরা ইলমের প্রচার-প্রসার ও সাওয়াবের আশায় এমনটি করে থাকেন।

অথবা লেখকের বা কিতাবের মালিকের অনুমিত ব্যাতিত তা আপলোড-ডাউনলোড করা হয়েছে। তবে ডাউনলোড করার পাঠকের উদ্দেশ্য নিজে পড়ে উপকৃত হওয়া। কোন ব্যবসায়ী চিন্তা তার নেই এবং পাঠক মূল কিতাব থেকে চুরি করে বা নকল করে প্রচারের চেষ্টা করেনা। এমতাবস্থায়, মালিকপক্ষ ও লেখদের জন্য শিক্ষক-ছাত্রদেরকে কিতাব ডাউনলোড করা ও পড়তে বাধা দেওয়ার অধিকার নেই।

কারারাতুন মাজমুআ থেকে যদিও এটাকে লেখক ও প্রকাশকের হক্ব বলা হয়েছে, যা ঠিক নয়। তাই প্রথমে “ব্যবসায়িক লাভ অর্জনের গণ্ডি” ও “নকল বা জাল করার ক্ষতি থেকে বিরত রাখার গণ্ডি” ভালো করে বুঝতে হবে। সব রকম উপকার নেওয়ার ধরন প্রকাশক ও লেখককে তার হক্ব প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাধা দান করে না। অনেকে তো এও বলে, যদি কেউ কোন লেখক বা প্রবন্ধকার ক্ষেত্র বিশেষে নিজ লেখা তাদের দিকে সম্পৃক্ত করে লেখে তবে সেই লেখক বা প্রবন্ধকারের অনুমিত ব্যতিত তার অংশ লেখা কোন ভাবেই জায়েজ না! (অথচ বিষয়টি এমন নয়)

শায়খ মুহাম্মদ বিন সালিহ উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
আমাদের মতে, যদি কোন ব্যক্তি ব্যক্তিগত ব্যাবহারের জন্য এমন করে তবে সমস্যা নেই। আর যদি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য করে তবে জায়েজ নেই। যেহেতু এতে তাদের ক্ষতি করা হবে।
সামারতুত তাদবীন – ১৪২ পৃ:

শায়খ রাহিমাহুল্লাহ আরো বলেন,
আমি মনে করি, মানুষ যদি কেবল তার নিজের জন্য নকল করে তবে সমস্যা নেই। তবে যদি ব্যবসায়ের উদ্দেশ্য এমন করে তবে জায়েজ নেই, যেহেতু এতে অন্যকে ক্ষতি করা হয় এবং “বাইয়ুল মুসলিম আলাল মুসলিম “-এর কারণে নিষিদ্ধ। যেমন, প্রকাশক বা লেখক লিখে বাজারে ১০০ টাকা মূল্যমান নির্ধারন করে ছাড়ল। আর তুমি তা নকল করে বাজারে ৫০ টাকা মূল্যে ছেড়ে দিলে, এটা জায়েজ নেই। লিকয়ুল বাবিল মাফতুহ-১৯/১৭৮; এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে আনা হয়েছে

দ্রষ্টব্যঃ তবে একটি কথা মাথায় রাখা প্রয়োজন। বইয়ের স্বাদ কখনো পিডিএফ দিয়ে হয় না। তাই সামর্থ থাকলে বই কিনে পড়াই উত্তম। এতে টাকা খরচের সাথে সাওয়াব বেশি পাওয়া যায়, সাথে প্রকাশনী ও লেখকের অনেক উপকার হয়। তবে একান্ত মা’যুর হলে তবেই পিডিএফ পড়ুন। নতুবা নিজে কিনে পড়া ও অপরকে কিনে পড়তে উৎসাহ দেওয়া উচিত।
ফাতওয়া link

প্রশ্ন: বিভিন্ন বইয়ের শুরুতে লেখা থাকে- ‘লেখক/প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।’ বর্তমানে কিছু বইয়ে কথাটি আরো লম্বা করে লেখা থাকে। যেমন, ‘প্রকাশক এবং স্বত্বাধিকারীর লিখিত অনুমতি ছাড়া এ বইয়ের কোনো অংশের পুনরুৎপাদন বা প্রতিলিপি করা যাবে না, যান্ত্রিক উপায়ে কোনো প্রতিলিপি করা যাবে না, ডিস্ক বা তথ্য সংরক্ষণের কোনো যান্ত্রিক পদ্ধতিতে উৎপাদন বা প্রতিলিপি করা যাবে না। এ শর্তের লঙ্ঘন দেশীয় ও ইসলামী আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দণ্ডনীয়।’
এ কথার দ্বারা শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে ক্রেতার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপকে নিষেধ করা হয়?

উত্তর: কোনো বইয়ের স্বত্ব লেখক বা প্রকাশক কর্তৃক সংরক্ষিত হওয়ার উদ্দেশ্য হল, ঐ বইয়ের মুদ্রণ ও প্রকাশনার সকল অধিকার লেখক বা প্রকাশকের। এভাবে স্বত্ব সংরক্ষণ করা জায়েয। এক্ষেত্রে লেখক বা প্রকাশকের অনুমতি ছাড়া উক্ত বইয়ের মুদ্রণ ও বাজারজাত করা জায়েয নেই। তবে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছাড়া নিজ ব্যবহারের জন্য পিডিএফ বা ফটোকপি করা নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই কোনো বই দুষ্প্রাপ্য হওয়ার কারণে বা মূল বইয়ের দাম নিজের সাধ্যের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় কারো মালিকানাধীন কোনো বই তার অনুমতি নিয়ে নিজ ব্যবহারের জন্য ফটোকপি করা বা অন্য কোনোভাবে এর প্রতিলিপি তৈরি করে সংরক্ষণ করা নাজায়েয নয়। এটি লেখকের حقوق তথা স্বত্বের খেলাফ বলে ধর্তব্য হবে না।
-মাজাল্লাতু মাজমাইল ফিকহিল ইসলামী, সংখ্যা ৫, ৩/২৫৮১
মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া ঢাকা

একটা সময় ছিল, যখন আমরা PDF পড়া যাবে না এরকম মর্মের ফাতাওয়া খুজেও পেতাম না। মনে আছে কালামুল্লাহ ডট কমে PDF পড়ার পক্ষে বেশ কিছু ফাতাওয়া মজুদ ছিল। নেটে খুঁজে মনে হয় মেধাসত্ত্বের পক্ষে কেবল মুফতি তাকি উসমানীর [হাফি.] ফাতাওয়া পাওয়া যেত।

আজকাল যে কোনো কারণেই হোক এ বিষয়ক এক ধরণের সচেতনতা বেড়েছে। এর ফলে অনেকে এ ধরণের পরহেজগারিতায় পড়েছেন যে নিজে তো PDF পড়েন না (অনুমোদিত না হলে) অপরকেও পড়তে নিরুৎসাহিত করেন। মনে রাখতে হবে এটা একটা মুজতাহাদ ফিহ মাস’আলাহ এবং মুখতালাফ ফিহও বটে। এতে বেশ ভালো মানে ইখতিলাফ রয়েছে।

প্রথম, বাংলাদেশে যারা ইসলামী বই ছাপায় তাদের প্রায় কারওই গ্রন্থ সত্ত্ব সরকার থেকে রেজিস্ট্রেশন করা থাকেনা। যার নিজেরই সত্ত্ব নেই সে আরেক জনকে ধরবে কীভাবে? এরপরো কেউ কেউ একটা বইয়ের সত্ত্ব নিয়ে সব বইয়ের মধ্যে ওটাই ছাপিয়ে দেয়-এমন রেকর্ডও আছে।

দ্বিতীয়ত, যদি তাদের সত্ত্ব থাকতোও এরপরও নন ইনফ্রিঞ্জমেন্টের ধারা মোতাবেক সর্বোচ্চ ৩ কপি পর্যন্ত ব্যক্তিগত প্রয়োজনে যে কেউ পুনঃমুদ্রণ করতে পারতেন। যে কেউ চাইলে কপি রাইট আইনের নন-ইনফ্রিঞ্জমেন্ট ধারাগুলো পড়ে নিতে পারেন।

এতো গেল সত্ত্ব রাখা যায় এটা ধরে নিয়ে আইন নিয়ে আলোচনায় কী বের হয় তা নিয়ে। এবার আমরা অন্যদিকটা দেখি, সেটা হচ্ছে এই সত্ত্বই সঠিক না-এটা ফুকাহাদের এক দলের মত। আমরা পাকিস্তানের প্রখ্যাত দ্বীনি ইদারা জামিয়া বিনুরি টাউনের একটা ফাতাওয়া দেখব। তাদেরকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে প্রসিদ্ধ বই আপ কে মাসায়েল আউর উন কা হাল -এর PDF কি পড়া যাবে? কেননা এটা তো লেখক/প্রকাশনের অনুমতি ব্যতীত অননুমোদিত PDF. তাদের উত্তর ছিল-

پی ڈی ایف کی صورت میں موجودکتاب آپ کے مسائل اور ان کاحل سے آپ استفادہ کرسکتے ہیں،اور ڈاؤن لوڈ کرنابھی درست ہے۔دینی امورسے متعلق تصنیفات ،دینی کتابوں کورائلٹی کی صورت میں محفوظ کرنا درست نہیں،اس لیے مصنف کی اجازت کے بغیربھی اسلامی کتب کو اپ لوڈ کیاجاسکتاہے اورکمپیوٹرمیں بھی محفوظ کرسکتے ہیں۔تفصیل کے لیے فتاویٰ بینات جلد دوم ،کتاب المعاملات صفحہ:124تا131 کامطالعہ کیاجائے۔جامعہ نے مذکورہ کتاب کوپی ڈی ایف کی شکل میں پیش نہیں کیا ہے۔فقط واللہ اعلم

“PDF হিসেবে রক্ষিত আপকে মাসায়েল আউর উন কা হাল থেকে আপনি উপকৃত হতে পারেন। আর ডাউনলোড করাও সঠিক হবে। দ্বীনি বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত লেখনী, দ্বীনি বইকে রয়্যালটির হিসেবে সুরক্ষিত রাখা সঠিক নয়। এজন্য লেখকের অনুমতি ব্যতীতও ইসলামী বইপত্রকে আপলোড করা যাবে এবং কম্পিউটারেও সংরক্ষণ করা যাবে। আরও বিস্তারিত জানতে ফাতাওয়া বায়্যিনাতের ২য় খণ্ডের কিতাবুল মু’আমালাতের ১২৪- ১৩১ পৃষ্ঠা পড়ুন। জামিয়া এই কিতাবকে এখনো PDF বানায় নি (অর্থাৎ হার্ডকপি সংগ্রহ করে পড়তে পারেন)। আল্লাহই সর্বোত্তম জ্ঞাত

ফাতাওয়া নাম্বার: 143808200010

খোলাসা: যদি কেউ মনে করে সে অননুমোদিত PDF পড়বে না, সেটা ভালো, সে না-ই পড়তে পারে। কিন্তু যারা পড়ছে তাদের ব্যাপারে আপত্তির কোনো সুযোগ আছে বলে মনে করিনা।
-Manzurul Karim

⚠ পিডিএফটি সম্পর্কে কোনো অভিযোগ বা মতামত থাকলে, ইমেইল করুন

একইরকম আরও পিডিএফ

Back to top button